ফজরের নামায আদায়কালে য‌দি সূর্য ও‌ঠে যায়, তাহলে কি নামায ভেঙে যাবে?

প্রশ্নঃ ফজরের নামায আদায়কালে য‌দি সূর্য ও‌ঠে যায় অথবা আছরের নামায আদায়কালে য‌দি সূর্য ডুবে যায়, তাহলে কি নামায ভেঙে যাবে?

উত্তরঃ বিস‌মিল্লা‌হির রহমা‌নির রহীম!
হানাফী ফিক‌হের মূলভাষ্য ম‌তে ফজ‌রের নামা‌য আদায় কালীন য‌দি সূর্য উ‌দিত হ‌য়ে যায়, তা হ‌লে নামায ভে‌ঙে যা‌বে। সূর্য উদ‌য়ের পর তাকে নতুন ক‌রে নামায পড়তে হ‌বে। এ‌টি ফিক‌হে হানাফীর (ظاهر الرواية) বা মূলভাষ্য।
পক্ষান্তরে অন্য তিন ইমা‌মের ম‌তে নামায ভাঙ‌বে না। কা‌জেই সে নামায আদায় কর‌তে থাক‌বে এবং পূর্ণ কর‌বে। এরূপ এক‌টি মত ইমাম কাযী আবু ইউসু‌ফ রহিমাহুল্লাহ-ও ব্যক্ত ক‌রে‌ছেন।

পূর্ববর্তী হানাফী ফকীহগণ তাঁ‌দের মতের সপ‌ক্ষে বি‌স্তা‌রিত দলীল পেশ করে‌ছেন। বি‌শেষক‌রে সূ‌র্যোদ‌য়ের সময় নামায পড়া হারাম সংক্রান্ত হাদীস‌গু‌লো এবং ফজ‌রের নামা‌যের সময় সংক্রান্ত হাদীসগু‌লো তা‌দের উক্ত ম‌তের ভি‌ত্তি!
কিন্তু ক‌য়েক‌টি কার‌ণে পরবর্তী অ‌নেক হানাফী ফকীহ এ মত‌টির গ্রহণ ক‌রেন‌নি; বরং তাঁরা কুরআন ও সুন্নাহর আ‌লো‌কে এমন মত ব্যক্ত ক‌রে‌ছেন, যা অন্য তিন ইমা‌মের মতের অনুরূপ। তাঁরা ব‌লে‌ছেন, সূর্য উদ‌য়ের দ্বারা নামায ফা‌সেদ হ‌বে না; বরং তা‌কে নামায চা‌লি‌য়ে যে‌তে হ‌বে।

যেসব দলী‌লের ভি‌ত্তি‌তে তাঁরা এ মত‌কে প্রাধান্য দি‌য়ে‌ছেন, তন্ম‌ধ্যে :
১) কুরআন মাজী‌দে ইরশাদ হ‌য়ে‌ছে :
لا تبطلوا اعمالكم
“তোমরা তোমা‌দের আমল নষ্ট ক‌রো না।”
(সূরা মুহাম্মাদ : ৩৩)

য‌দি এক রাকাআত পর সূর্য উদ‌য়ের কার‌ণে নামায প‌রিত্যাগ কর‌তে হয়; তা হ‌লে আদায়কৃত এক রাকাআত নামায নষ্ট হ‌য়ে যায়; যা আয়া‌তের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

২) হাদীস শরী‌ফে ব‌র্ণিত হ‌য়ে‌ছে :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الصُّبْحِ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ فَقَدْ أَدْرَكَ الصُّبْحَ وَمَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الْعَصْرِ قَبْلَ أَنْ تَغْرُبَ الشَّمْسُ فَقَدْ أَدْرَكَ الْعَصْرَ ‏”
আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত :
তিনি বলেছেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন : সূর্যোদয়ের পূর্বে কেউ যদি ফজরের এক রাক’আত পেল, সে ফজরের নামায পে‌য়ে গেল। আর যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে ‘আসরের নামা‌যের এক রাক’আত পেল, সে যেন ঠিক ওয়াক্তেই ‘আসরের নামায পেল।”
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১২৬১)

উক্ত হাদী‌সে সূ‌র্যোদ‌য় ও সূ‌র্যো‌স্তের পূ‌র্বে যথাক্র‌মে ফজর ও আস‌রের কো‌নো এক রাকাআত পে‌য়ে গেলে উক্ত নামাযদ্বয় পে‌য়ে‌ছে ব‌লে গণ্য করা হ‌য়ে‌ছে। আর তা পাওয়ার অর্থই হ‌লো নামায পূর্ণ করা। এখা‌নে ফজর ও আস‌রের মা‌ঝে কো‌নো পার্থক্য করা হয়‌নি। কা‌জেই সূর্যাস্ত দ্বারা যেমন নামায ভঙ্গ হ‌বে না,‌ তেম‌নি সূর্য উদয় হওয়া দ্বারাও নামায ভঙ্গ হ‌বে না।

৩) হাদীস শরী‌ফে সূর্য উদ‌য়ের সময় নামায ইব‌তিদা (الابتداء) তথা শুরু কর‌তে নি‌ষেধ করা হ‌য়ে‌ছে; ই‌স্তিদামা (الاستدامہ) তথা বহাল রাখা‌কে নি‌ষেধ করা হয়‌নি।
যে‌লোক সূর্য উদয়ের পূ‌র্বে নামায শুরু ক‌রে‌ছে, আর এমতাবস্থায় সূর্য উদয় হ‌য়ে যায়, যা‌তে তার কো‌নো ইখ‌তিয়ার নেই; তা হ‌লে তার নামায নষ্ট হওয়ার কথা নয়। কারণ, সে তো নামায সূর্য উদ‌য়ের সময় আরম্ভ ক‌রে‌নি, বরং এর পূ‌র্বে আরম্ভ ক‌রে‌ছে। হাদী‌সে ইব‌তিদা নি‌ষেধ, ই‌স্তিবকা নয়!

এটা ঠিক ইহরাম প‌রি‌হিত ব্য‌ক্তির ম‌তো, যার জন্য এমতাবস্থায় বি‌য়ের নতুন আকদ করা নি‌ষেধ, কিন্তু পূর্ব‌বি‌য়ে বহাল রাখতে কো‌নো অসু‌বিধা নেই!
অথবা চামড়ার মোজা প‌রিধানকারীর ম‌তো। সে ব্য‌ক্তি হদস জা‌রি অবস্থায় মোজা পর‌লে হ‌বে না; কিন্তু মোজা পরার পর হদস হওয়ার দ্বারা মোজার মা‌সেহ নষ্ট হ‌বে না।
(‌বিস্তা‌রিত দেখুন : ফতহুল মল‌হিম শর‌হে মুস‌লিম : ৩/ ৪৭৪)

৪) হানাফী ফিক‌হের উসুল ও মূলনীতি হ‌লো : “শরঈ বিষ‌য়ে শরঈ নি‌ষেধাজ্ঞা অ‌রোপিত ‌হওয়া বিষয়‌টির শুদ্ধতার প‌রিপন্থী নয়।” কা‌জেই নি‌ষিদ্ধ সম‌য়ে নামায পড়ার দ্বারা নামায অশুদ্ধ হওয়ার কো‌নো কারণ নেই। য‌দিও একার‌ণে তার গোনাহ হ‌বে।

এ সব প্রমাণা‌দির চুল‌চেরা বি‌শ্লেষ‌ণের পর বহু হানাফী ফকীহও নামায নষ্ট না হওয়ার প‌ক্ষে মত দি‌য়ে‌ছেন, তন্ম‌ধ্যে আল্লামা ইবনু নজাইম রহিমাহুল্লাহ, ফকীহুন নফস রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহিমাহুল্লাহ, আল্লামা শি‌ব্বির আহমাদ উসমানী রহিমাহুল্লাহ উ‌ল্লেখ‌যোগ্য। সমকা‌লের শ্রেষ্ঠ ফকীহ মুফতী তাকী উসমানী হা‌ফিযাহুল্লাহও ঠিক একই মত পোষণ ক‌রে‌ছেন।

ইব‌নে নুজাইম লি‌খে‌ছেন :
وفي القنية : کسالی العوام اذا صلوا الفجر وقت الطلوع لاینکر علیھم۔ لانھم لو منعوا یترکونھا اصلا ظاھرا ولو صلوھا تجوز عند اصحاب الحدیث۔ والاداء الجائز عند البعض اولی من الترک اصلا۔
البحر الرائق : ١\٢٥١

রশীদ আহমাদ গঙ্গুহী রহিমাহুল্লাহ من أدرك ركعة হাদীস‌টির ব্যাখ্যা করার পর লি‌খে‌ছেন :
وأنت تعلم ما فيه من الاختلال وتزويق المقال فإن قولهم النهي عن الأفعال الشرعية يقتضي صحتها في أنفسها . ينادي باعلي نداء علي جواز الصلاتين كلتيهما وان اعتراهما حرمة بعارض التشبه بعبدة الشمس فادعاء المعارضة بينهما باطل وان قطع النظر عن ذلك فلا وجه لعدم الجواز في الفجر والجواز في العصر .
(الكوكب الدري ١/١٠٣)

আল্লামা শি‌ব্বির আহমদ উসমানী রহিমাহুল্লাহ দীর্ঘ সারগর্ভ আ‌লোচনা শে‌ষে লি‌খে‌ছেন :
والذي يترجح بحسب الأدلة من مجموع الروايات في المسألة مع مراعاة أصول الحنفية هو : جواز الإتمام لمن صلي ركعة من الفجر او العصر قبل الطلوع او الغروب. (فتح الملهم: ٣/ ٤٧٤)

শাইখুল ইসলাম তাকী উসমানী হা‌ফিযাহুল্লাহ এ সংক্রান্ত সকল হাদীস ও ফিকহী আ‌লোচনা শেষ ক‌রে লি‌খে‌ছেন :
حقیقت یہ ہے کہ اس مسئلہ میں حنفیہ کی طرف سے کوئی ایسی توجیہ اب تک احقر کی نظر سے نہیں گذری جو شافی اور کافی ہو۔ اسلئے حدیث کو توڑ موڑ کر حنفیہ کی مسلک پر فٹ کرنا کسی طرح مناسب نہیں۔۔۔۔۔۔ ان اوقات میں نماز پڑھنا ناجائز تو ہے لیکن اگ کوئی پڑھ لے تو ادا ہوجائیگی۔(درس ترمذی : ؛١/ ٤٣٩ )

উপরোক্ত উদ্ধৃ‌তিগু‌লো দ্বারা প্রমা‌ণিত হ‌লো, এ সব হানাফী ফকীহগণ উক্ত মাসআলায় ঠিক সেই মত পোষণ ক‌রেছেন, যা অন্য তিন ইমাম পোষণ ক‌রে‌ন। অর্থাৎ, আস‌রের নামায যেমন সূর্যাস্ত দ্বারা ভঙ্গ হ‌বে না, তেম‌নি ফজ‌রের নামায সূর্যোদ‌য়ের কার‌ণে নষ্ট হ‌বে না। বরং নামায চা‌লি‌য়ে যা‌বে। এ‌তে তার নামায আদায় হ‌য়ে যা‌বে। পুনরায় নামায পড়‌তে হ‌বে না। য‌দিও এ সময় নামায শুরু করা মাকরূহ।

হাঁ, ঠিক সূর্য উদ‌য়ের সময় নামায শুরু করা কো‌নো ম‌তেই জা‌য়িয হ‌বে না। বরং পূর্ণ উদয় সম্পন্ন হওয়ার অ‌পেক্ষা কর‌বে। তারপর নামায শুরু করবে।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ!