প্রশ্নঃ আছরের মাকরূহ ওয়াক্ত সূর্যাস্তের কত মিনিট পূর্বে আরম্ভ হয়?
উত্তরঃ সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বে যখন তা হলুদবর্ণ ধারণ করে এবং তার আলোর প্রখরতা কমে যাওয়ায় তার উপর দৃষ্টি স্থির করা যায় তখন থেকে আসরের মাকরূহ ওয়াক্ত আরম্ভ হয়। কোনো কোনো ফকীহ বলেছেন, সূর্য যখন অস্তাচল থেকে এক বর্শার কম উপরে নেমে আসে তখন থেকে মাকরূহ ওয়াক্ত শুরু হয়। ইচ্ছাকৃত এ সময় পর্যন্ত আসরের নামাযকে বিলম্বিত করা মাকরূহ তাহরীমী তথা নাজায়েয।
সুতরাং উক্ত সময়ের অন্তত এতটুকু আগেই আসরের নামায আদায় করে নেওয়া জরুরি যে, যদি কোনো কারণে নামায পুনরায় আদায় করতে হয় বা জামাতে কেউ মাসবুক হয় তাহলে উল্লেখিত মাকরূহ ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই যেন তা পূর্ণ করা যায়।
হযরত আলী ইবনে শায়বান রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
قَدِمْنَا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمَدِينَةَ فَكَانَ يُؤَخِّرُ الْعَصْرَ مَا دَامَتِ الشَّمْسُ بَيْضَاءَ نَقِيَّةً.
‘আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট মদীনায় আগমন করলাম। সে সময় তিনি সূর্য উজ্জল ও পরিষ্কার থাকা পর্যন্ত (অর্থাৎ সূর্যের আলো পরিবর্তন হওয়ার পূর্বে) আসরের নামায বিলম্ব করে আদায় করেছেন।’
[সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৪০৮]
হযরত উকবাহ ইবনে আমির রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন-
ثَلَاثُ سَاعَاتٍ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَانَا أَنْ نُصَلِّيَ فِيهِنَّ، أَوْ نَقْبُرَ فِيهِنَّ مَوْتَانَا: حِينَ تَطْلُعُ الشَّمْسُ بَازِغَةً حَتَّى تَرْتَفِعَ، وَحِينَ يَقُومُ قَائِمُ الظَّهِيرَةِ حَتَّى تَمِيلَ، وَحِينَ تَضَيَّفُ الشَّمْسُ لِلْغُرُوبِ حَتَّى تَغْرُبَ.
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে তিন সময়ে নামায আদায় করতে এবং আমাদের মৃত ব্যক্তিদের দাফন করতে নিষেধ করতেন। সূর্যোদয়ের সময় থেকে তা উপরে না উঠা পর্যন্ত, ঠিক দুপুর বেলায় সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে না পড়া পর্যন্ত এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার নিকটবর্তী হলে, তা সম্পূর্ণ অস্তমিত না হওয়া পর্যন্ত।’
[সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৮৩১]
আর পাক-ভারত উপমহাদেশের আকাবির আলেমগণ যথাযথ নিরীক্ষণ পূর্বক ঘড়ির কাঁটার হিসাবেও উক্ত সময়টিকে নির্ধারণ করেছেন। এক্ষেত্রে সতর্কতাবশত কেউ কেউ সূর্যাস্তের আধা ঘণ্টা বা পৌনে এক ঘণ্টা পূর্বে মাকরূহ ওয়াক্ত আরম্ভ হওয়ার কথা বলেছেন। (দেখুন: খাইরুল ফাতাওয়া ২/১৯৪)। কিন্তু অধিকাংশ আলেমগণ তা গ্রহণ করেননি। তাঁদের অভিমত নিম্নরূপ:
১. আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রহ. হযরত গাঙ্গুহী রহ.-এর উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, সূর্যাস্তের দশ মিনিট পূর্বে সূর্য হলুদবর্ণ ধারণ করে। আর তখন থেকে মাকরূহ ওয়াক্ত আরম্ভ হয়। [ইমদাদুল আহকাম ১/৪১৩]
২. পাকিস্তানের মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী রহ. বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছেন, ঋতুভেদে আসরের মাকরূহ ওয়াক্ত সূর্যাস্তের ১৩ মিনিট পূর্ব থেকে সর্বোচ্চ ১৬ মিনিট পূর্বে আরম্ভ হয়।
[আহসানুল ফাতাওয়া ২/১৪৩]
৩. মুফতী রেযাউল হক দা.বা. (দক্ষিণ আফ্রিকা) এক প্রশ্নের জবাবে সূর্যাস্তের ১৫ মিনিট পূর্বের মুহূর্তকে মাকরূহ ওয়াক্তের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করেছেন।
[ফাতাওয়া দারুল উলূম যাকারিয়া ২/৫৮]
অতএব সূর্যাস্তের ১৫-১৬ মিনিট পূর্বেই আসরের নামায আদায় করে নিতে হবে। ইচ্ছাকৃত এর চেয়ে বেশি বিলম্ব করা যাবে না।
তবে কেউ যদি কোনো কারণে কোনো দিন আসরের নামায উক্ত সময়ের পূর্বে পড়তে না পারে তাহলে সেক্ষেত্রে সূর্যাস্তের আগমুহূর্তে হলেও তাকে তা পড়ে নিতে হবে। কাযা করা যাবে না। কারণ হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ أَدْرَكَ رَكْعَةً مِنَ الْعَصْرِ قَبْلَ أَنْ تَغْرُبَ الشَّمْسُ فَقَدْ أَدْرَكَ الْعَصْرَ
‘যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের নামাযের এক রাকআত পেল সে আসরের নামায পেল।’
[সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৭৯; আদ্দুররুল মুখতার ১/৩৬৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/১৫১; ফাতাওয়া উসমানী ১/৩৯১]
উল্লেখ্য যে, শরীয়তে আসরের নামাযের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ আসরের সময় পেশাজীবীরা কর্মব্যস্ত এবং অন্যরা চিত্ত বিনোদনে ব্যস্ত থাকে। ফলে এ সময়ে নামায আদায় করা অনেকের জন্য কষ্টকর হয়ে যায়। তাই আসরের নামায সময়মতো আদায়ের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া একান্ত জরুরি। আর নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নামায আদায় করার ফযীলত অনেক বেশি। সুতরাং ওয়াক্তের শুরুতে নামায আদায় করে নেয়ার চেষ্টা করা উচিত।
