টাখনুর নিচে কাপড় পরার শরঈ বিধান

টাখনুর নিচে কাপড় পরার শরঈ বিধান

ইসলামী শরীয়াহ মতে—পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় পরা নিষিদ্ধ। আবাসহ সব ধরনের পোষাকই পুরুষের জন্য টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরা নাজায়েয। তাকাববুর বা অহংকারের নিয়ত না থাকলেও এটা নাজায়েয। আর তাকাববুরের নিয়তে করা তো আরো মারাত্মক গুনাহ। হারাম হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের নুসুস (বক্তব্য) একেবারেই সুস্পষ্ট। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
مَا أَسْفَلَ مِنَ الكَعْبَيْنِ مِنَ الإِزَارِ فَفِي النَّارِ .
‘টাখনুর নিচের যে অংশ লুঙ্গী (ইত্যাদি) দ্বারা ঢাকা থাকবে তা জাহান্নামে যাবে।’ [সহীহ বুখারী, হাদিস ৫৭৮৭]

অপর হাদিসে এসেছে—
ثَلَاثَةٌ لَا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ، وَلَا يَنْظُرُ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ، وَلَا يُزَكِّيهِمْ، وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ» قُلْتُ: مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَدْ خَابُوا وَخَسِرُوا؟ فَأَعَادَهَا ثَلَاثًا، قُلْتُ: مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ خَابُوا وَخَسِرُوا؟ فَقَالَ: «الْمُسْبِلُ، وَالْمَنَّانُ، وَالْمُنَفِّقُ سِلْعَتَهُ بِالْحَلِفِ الْكَاذِبِ – أَوِ الْفَاجِرِ

আবূ যার রাযি. সূত্রে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তিন প্রকার লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি (রহমতের নজরে) দেখবেন না এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন না, আর তারা কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কারা? নিঃসন্দেহে এরা ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একথাটা তিনবার বললেন, আর আমিও তাঁকে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরা কেমন লোক? এরা তো ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বললেন—ক. যে ব্যক্তি টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখে। খ. যে ব্যক্তি দান করে খোঁটা দেয়। গ. যে ব্যক্তি মিথ্যা বা ধোঁকাপূর্ণ কসম করে পণ্য বিক্রি করে। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৪০৮৭,সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০৬, সুনানে নাসাঈ ৫৩৩৩]

এসব হাদিসে জাহান্নামের কঠিন ধমকির কথা এসেছে, তাতে
তাকাববুর বা অহংকারের কোনো শর্ত নেই। অন্য একটি হাদিসে লুঙ্গি, জামা এবং পাগড়িকেও টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পরতে নিষেধ করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
الْإِسْبَالُ فِي الْإِزَارِ، وَالْقَمِيصِ، وَالْعِمَامَةِ، مَنْ جَرّ مِنْهَا شَيْئًا خُيَلَاءَ، لَمْ يَنْظُرِ اللهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
‘লুঙ্গি, জামা এবং পাগড়ির ক্ষেত্রে (টাখনুর নিচে) ঝুলিয়ে পরার একই বিধান। যে ব্যক্তি এগুলোর কোন একটি অহংকার বশত (টাখনুর নিচে) ঝুলিয়ে পরবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে দৃষ্টি দিবেন না।’ [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪০৯১]

আর নামাযের মধ্যে টাখনুর নিচে কাপড় থাকলে নামায মাকরূহ হবে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
مَنْ أَسْبَلَ إِزَارَهُ فِي صَلَاتِهِ خُيَلَاءَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي حِلٍّ وَلَا حَرَامٍ.
যে ব্যক্তি নামাযে অহঙ্কারবশতঃ নিজ কাপড় (পায়ের গিরার নিচে) ঝুলিয়ে রাখে, আল্লাহ তার জন্য ‘জান্নাত’ হালাল করবেন না এবং ‘জাহান্নামও’ হারাম করবেন না। [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৬৩৭]

সহীহ বুখারিতে এসেছে—
عَنْ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ لاَ يَنْظُرُ اللهُ إِلٰى مَنْ جَرَّ ثَوْبَه“ خُيَلاَءَ
ইবনু ’উমার রাযি. হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ তায়ালা সেই ব্যক্তির প্রতি (দয়ার) দৃষ্টি দিবেন না, যে অহঙ্কারের সাথে তার পরিধেয়) পোশাক টেনে চলে। [সহীহ বুখারি ৫৭৮৩, মুসলিম ৩৭/৮, হাদিস ২০৮৫, মুসনাদো আহমাদ ৫৩৭৭]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَإِيَّاكَ وَإِسْبَالَ الْإِزَارِ، فَإِنَّهَا مِنَ الْمَخِيلَةِ، وَاللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى لَا يُحِبُّ الْمَخِيلَةَ
সাবধান! তোমরা জামা (টাখনুর নিচে) ঝুলিয়ে পরিধান থেকে বেঁচে থাকো। কেননা এটা অহংকার। আর আল্লাহ তাআলা অহংকারকারীকে পছন্দ করেন না। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৬৬১৬]

عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَا سُفْيَانَ بْنَ سَهْلٍ، لَا تُسْبِلْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُسْبِلِينَ»
মুগীরা ইবনে শোবা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ হে সুফিয়ান ইবনে সাহল! পরিধেয় বস্ত্র (গোছার নিচে) ঝুলিয়ে পরো না। কারণ আল্লাহ তা‘আলা এভাবে পরিধেয় বস্ত্র ঝুলিয়ে পরিধানকারীদের পছন্দ করেন না। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৫৭৪]

এছাড়া বিভিন্ন হাদিসেও এ ব্যাপারে কঠিন ধমকি এসেছে। তাই পুরুষের জন্য শরীরের কোনো কাপড় যেন টাখনুর নিচে চলে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তাকাববুরের নিয়ত না থাকলেও এটা নাজায়েয। আর তাকাববুরের নিয়তে করা তো আরো মারাত্মক গুনাহ। হাদিস শরীফে এ কাজটিকেই তাকাববুরের আলামত বলা হয়েছে। সুতরাং এ থেকে বিরত থাকা জরুরি।

(মুআত্তা ইমাম মালেক, হাদীস ৩৩৯০, ফাতহুল মুলহিম ৪/১২৩, শরহে মুসলিম, নববী ১৪/৬২, আলইসতিযকার ৭/৩১৪, বযলুল মাজহুদ ১৬/৪২৪, ইমদাদুল আহকাম ৪/৩৩৬)